
সিনেমাজগতের উপমহাদেশের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি ও সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী, অভিনেতা, সুরকার ও পরিচালক কিশোর কুমারের আজ জন্মদিন।
১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট মধ্যপ্রদেশের খন্ডওয়াতে জন্মগ্রহণ করা এই বহুমুখী প্রতিভাধর শিল্পী তার জাদুকরী কণ্ঠ, অনবদ্য ‘ইয়োডেলিং’ শৈলী এবং খামখেয়ালি ব্যক্তিত্বের জন্য সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। বলিউডের পাশাপাশি বাংলা গানেও তার অবদান ছিল অতুলনীয়। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর এই মহান শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন।
সেই সংগীতশিল্পীকে আঁকড়ে আজও বেঁচে আছেন গায়ক গৌতম ঘোষ। কিংবদন্তি গায়ক কিশোর কুমারের জন্মদিনে একটি গণমাধ্যমের এক সাক্ষাৎকারে জানালেন তাকে নিয়ে বেঁচে থাকার গল্প।
জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী গৌতম ঘোষের ‘কিশোরকণ্ঠী’ হিসাবেই সংগীতজগতে পরিচিত। একেবারে শৈশব থেকে কিশোর কুমারের গান খুব ভালো লাগত তার। সেই গান যেদিন বুঝতে শিখলেন গৌতম ঘোষ, সেদিনই বুঝতে পারলেন কিশোর কুমারকে। সেদিনই তাকে নতুন করে আবিষ্কার করলেন তিনি।
আমার বাবা ও মায়ের পর যদি কারও স্থান থাকে, তবে তিনি কিশোর কুমার। তিনি আমার ভগবান, তিনিই আমার অন্নদাতা। তিনি গান না গাইলে আমার কোনো দিন গান গাওয়া হতো না বলে জানান সংগীতশিল্পী গৌতম ঘোষ। তিনি বলেন, আমাকেও কেউ চিনত না। আমি হয়তো সরকারি কেরানি হতাম। কিন্তু আজও আমি কিশোর কুমারকে নিয়েই বেঁচে আছি।
ওর বিভিন্ন ধরনের গান শুনতাম। এই করতে করতে, ওর গান গাইতে গাইতেই গৌতম ঘোষ হয়ে গেলাম। সেই থেকেই শুরু সংগীতজগতে তার হাত ধরে আমার পথচলা।
আগে পাড়ার যে কোনো অনুষ্ঠানে সুযোগ চাইতাম কিশোর কুমারের গান গাওয়ার জন্য। এরপর ১৯৭৪ সালে পেশাদার হিসেবে গান গাওয়া শুরু করি। ওই কিশোর কুমারই আমার জীবনের সম্বল। ওর গান গেয়েই প্রথম রোজগার করেছিলাম ৩ বা ৪ টাকা। তখন ওই টাকার মূল্য ছিল অনেক। আমার কাঁধে সংসারের দায়িত্ব ছিল— বৃদ্ধ বাবা, মা, আর পাঁচ বোন। পুরো সংসার চালাতে পেরেছি শুধু কিশোর কুমারের জন্যই, ওর গান গেয়েই। অবশ্য ধীরে ধীরে পারিশ্রমিক বাড়ল। বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে, জলসায় অংশ নিয়ে রাতের পর রাত জেগে, একেক দিন দুটা-তিনটা করে অনুষ্ঠানও করেছি। আমাদের সময় তেমন প্রচারও ছিল না। শুধু কিশোর কুমারের জনপ্রিয়তার জেরেই আমি রয়ে গেছি।
তিনি বলেন, একটা দুঃখ ছিল, কিশোর কুমারের গান গাইতাম, কিন্তু ওকে সামনে থেকে কখনো দেখিনি। যেদিন তাকে প্রথম দেখলাম, সেটি আমার জীবনের ঐতিহাসিক দিন। ১৯৮৪ সালে আমি মুম্বাই চলে গিয়েছিলাম। ক্যারিয়ার তৈরি করতে নয়, কিশোর কুমারকে দেখার জন্য। ওখানে ঘুরে ঘুরে যে কোনো জায়গায় কিশোর কুমারের রেকর্ডিং থাকলেও আমি চলে যেতাম। কীভাবে তিনি গান গাইছেন, রেকর্ডিং করছেন, কীভাবে হাঁটছেন, কথা বলছেন— সব হাঁ করে দেখতাম। তিনি প্রতিটা গান গাওয়ার সময় যে আলাদা এক্সপ্রেশন দিতেন, সেটি দেখে রপ্ত করার চেষ্টা করতাম।
১৯৮৫ সালে অবশেষে আলাপ হলো কিশোর কুমারের সঙ্গে। মেহবুব স্টুডিওর রেকর্ডিস্ট ছিলেন অভিনন্দন ঠাকুর, তিনি আলাপ করিয়ে দিলেন। আমায় নিয়ে গিয়ে বললেন— ওর নাম গৌতম ঘোষ। ও কলকাতায় থাকে, আপনার গান গায়। চার লাইন গানও শুনিয়েছিলাম আমার গুরুদেবকে। মনে আছে, গেয়েছিলাম— ‘মেরে নয়না সাওন ভাদোঁ’। শুনে ভালো-খারাপ কিছুই বলেননি। আমি তো তখন ‘স্যার’ বলে ডাকতাম, পরে অবশ্য দাদা হয়ে গিয়েছিলেন। দাদা বলেই ডাকতাম। স্টুডিওতে দেখা হতো, কথা হতো।
একবার তার বাড়িতে গিয়েছিলাম গৌরীকুঞ্জে, চা খেতে। একা যেতে ভয় পেয়েছিলাম। তখন বাপ্পি লাহিড়ীর ম্যানেজার ছিলেন ভরতজি, তিনি আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন। কুড়ি-পঁচিশ মিনিট ছিলাম। আমার কাছে ওই সময়টা স্বপ্নের মতো। সেখানে ওর সঙ্গে গল্প হয়েছিল। আমায় কিছু টিপস দিয়েছিলেন, যা আমার কাছে একান্ত সম্পদ।
কিশোর কুমার বলেছিলেন— আমার গানটা আমার মতো করে গাওয়ার চেষ্টা কর না। প্রত্যেক শিল্পীর গান শুনে, প্রত্যেক শিল্পীর গান গাওয়ার চেষ্টা কর। তাহলে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে।
আবার বলেছিলেন— যে কোনো গান গাওয়ার আগে গানের কথা মুখস্থ করে বুঝে নেবে, একেবারে অন্তরে ঢুকিয়ে নিও, যাতে খাতা না দেখেও গাইতে পারো, তবেই সঠিক এক্সপ্রেশন দিতে পারবে।
গৌতম ঘোষ বলেন, সব শিল্পীই মহান। কিন্তু কিশোর কুমারের কণ্ঠস্বর আর একটাও হবে না। যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাসের মতো কণ্ঠ হবে না, ঠিক তেমনই কিশোর কুমার হবে না। ওর গানে এত নাটক, ওর গায়কী দিয়ে উনি হিট করে দিতেন। অমিত কুমারের মধ্যে পরবর্তী সময়ে এটা দেখেছি। কুমার শানুর মধ্যেও খানিকটা রয়েছে।
গলা ভালো রাখার জন্য আমায় অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওকে দেখেছি চিৎকার করে কথা বলতে, ফিসফিস করে কথা বলেননি কখনো। কিন্তু অযাচিত গলার ওপর চাপ দিতেন না। তবে অনুষ্ঠান কম করার পরামর্শ দিয়েছিলেন আমায়। বলতেন— যতটুকু দরকার, ততটুকুই অনুষ্ঠান কর।
দুর্ভাগ্য, কিন্তু কম অনুষ্ঠান করলে রোজগার করতে পারতাম না। ওর মতো অত রেকর্ডিং ছিল না আমাদের। আমি শুনেছিলাম, তিনি প্রতিদিন ১০০ গ্রাম করে টকদই খেতেন। আর বলতেন— গলাকে নিয়ে বেশি ভাবলে মুশকিল। গলাকে গলার মতোই থাকতে দাও। কথা বলার মতো করে গান গাও।
ওর জন্য সেভাবে কিছু করতে পারিনি। শুধু একটাই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে— আমি নিজের উদ্যোগে টালিগঞ্জ স্টুডিওপাড়ায় কিশোর কুমারের একটা মূর্তি স্থাপন করেছি। ২০০০ সালের ১৮ আগস্ট সেই মূর্তি উদ্বোধন করেছিলেন শক্তিমান অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী। কারণ জীবনের শেষ গান মিঠুনের লিপেই গেয়েছিলেন তিনি। নানা মানুষ নানা কথা বলেন, অন্য গানকে ওর শেষ গান বলেন। কিন্তু আমি জানি— আমি শেষ দিন রেকর্ডিংও ছিলাম।
১২ অক্টোবর মেহবুব স্টুডিওতে কিশোর কুমার আর আশা ভোঁসলের ডুয়েট গান রেকর্ড হয়েছিল। বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে ‘ওয়াক্ত কি আওয়াজ’ সিনেমার গান ‘গুরু গুরু’। মিঠুন আর শ্রীদেবীর সিনেমার জন্য গান রেকর্ড করেছিলেন। ওটাই ওর শেষ গান। পরের দিন বিকেলে খবর এলো— আমার গুরুদেব আর নেই।
একটাই আফসোস— তিনি ভারতবর্ষের গৌরব। তবে কোনো সরকারি পুরস্কার তিনি পাননি। যদি মরণোত্তর ভারতরত্ন পুরস্কার তাকে দেওয়া যায়, সেটি চাইব। শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করব। আমার কাছে আজ ওর একটাই স্মৃতি আছে— তাকে আঁকড়ে বাঁচি আজও। অমিত কুমারের কাছ থেকে কিশোর কুমারের একজোড়া জুতা নিয়ে এসেছি, সেটি আমার কাছে আছে। আজও অনুষ্ঠানে বেরোনোর আগে ওই জুতায় প্রণাম করে বের হই। আর একবার যদি গুরুদেবের দেখা পেতাম, ওর পায়ের ওপর মাথা রেখে হাউমাউ করে কাঁদতাম। তিনি নিশ্চয়ই বুকে টেনে নিতেন আমায়।
বিনোদন ডেস্ক
Leave a Reply