রামচরণ-উপাসনার প্রেমের গল্প

Written by

in

দক্ষিণী সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় অভিনেতা রামচরণ ও তার স্ত্রী উপাসনা কামিনেনির  জীবন শুধু বিনোদন জগতের কোনো সাধারণ প্রেমের গল্প নয়; বরং এটি ফিল্ম ও বিশাল ব্যবসায়ী সাম্রাজ্যের এক অভাবনীয় মেইলবন্ধন। তাদের একসঙ্গে পথচলার উত্থান, ব্যক্তিগত বোঝাপড়া এবং ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্পটি সত্যিই চমকপ্রদ। 

রামচরণ ও উপাসনার সম্পর্কের গল্পটিও বেশ আকর্ষণীয়। তারা  কলেজজীবনে একে অপরকে বন্ধু হিসেবে জানার পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একসময় কাজের ও পড়াশোনার কারণে দুজনের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি হলেও এ দূরত্বই তাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করে। অবশেষে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পরিণতি হিসেবে ২০১২ সালে হায়দরাবাদে এক জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় আয়োজনে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

রামচরণকে নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার এ তারকা অভিনয়, বক্স অফিস সাফল্য ও আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার কারণে প্রায়ই শিরোনামে থাকেন। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার স্ত্রী উপাসনা কামিনেনি। ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবসায়িক পরিবারের উত্তরাধিকারী, সফল করপোরেট নির্বাহী ও সমাজসেবী রামচরণপত্নী।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আবারও আলোচনায় এসেছেন উপাসনা। কারণ তিনি এমন এক ব্যবসায়িক পরিবারের সদস্য, যার সাম্রাজ্যের মূল্য প্রায় ৭৭ হাজার কোটি রুপি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পরিচয় নয়, নিজের কর্মক্ষেত্রেও তিনি তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র অবস্থান। 

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

বিনোদন জগতের তারকাদের পরিবারে অনেক সময় স্ত্রীদের পরিচয় কেবল তাদের স্বামীদের সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু উপাসনা কামিনেনির গল্প কিছুটা ভিন্ন কিছুটা আলাদা। তিনি যেমন একটি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী, ঠিক তেমনি নিজের দক্ষতা, নেতৃত্ব ও সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছেন।

রামচরণের জনপ্রিয়তা উপাসনাকে আলোচনায় এনেছে ঠিক, কিন্তু তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে তার নিজস্ব কাজ, দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্বের ক্ষমতা। ভারতের করপোরেট ও সামাজিক পরিসরে উপাসনা এমন এক নারীর প্রতীক, যিনি উত্তরাধিকার পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই উত্তরাধিকারকে অর্থবহ করে তুলেছেন নিজের কর্মের মাধ্যমে।

রামচরণপত্নীর জন্ম ভারতের সুপরিচিত কামিনেনি পরিবারে। এ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যবিমা খাতের সঙ্গে যুক্ত। তার দাদা প্রতাপ সিং রেড্ডি ভারতের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের পথিকৃৎদের একজন। তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে অ্যাপোলো হসপিটালস, যা আজ ভারতের সবচেয়ে পরিচিত হাসপাতাল নেটওয়ার্কগুলোর একটি। ছোটবেলা থেকেই উপাসনা ব্যবসা, নেতৃত্ব ও সমাজসেবার পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি সেটিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই তিনি শিক্ষাজীবন শেষ করে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হন।

উপাসনার মা শোভনা কামিনেনি করপোরেট জগতের অত্যন্ত পরিচিত মুখ। স্বাস্থ্যসেবা খাতের সম্প্রসারণে তার অবদান ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। উপাসনা বহুবার বলেছেন, মায়ের কাজ ও নেতৃত্ব তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।

অনেক সময় তারকাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ধারণা তৈরি হয় যে, তারা কেবল পারিবারিক পরিচয়ের কারণেই আলোচনায় থাকেন। কিন্তু উপাসনার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। জাইডাস গ্রুপের স্বাধীন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। বৈশ্বিক এ লাইফ সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠানে হাজারো কর্মী কাজ করে থাকেন। একই সঙ্গে তিনি অ্যাপোলো ২৪/৭-এর বোর্ড সদস্য। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, অনলাইন ফার্মেসি ও চিকিৎসা পরামর্শসেবাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এ প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

এ ছাড়া অ্যাপোলো হসপিটালসের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির নেতৃত্বও দিচ্ছেন তিনি। সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত। ফ্যামিলি হেলথ প্ল্যান ইনস্যুরেন্স টিপিএর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও কাজ করে আসছেন উপাসনা। স্বাস্থ্যবিমা খাতে তার কাজ তাকে করপোরেট অঙ্গনে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।

বহু ধনী পরিবারে উত্তরাধিকার ও সম্পদ বণ্টন নিয়ে দ্বন্দ্বের খবর শোনা যায়। কিন্তু উপাসনার পরিবার এ সমস্যার সমাধানে অনেক আগে থেকেই একটি বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। রামচরণপত্নী জানিয়েছেন, তাদের পরিবারে একটি লিখিত ‘ফ্যামিলি কনস্টিটিউশন’ বা পারিবারিক সংবিধান রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের অধিকার, দায়িত্ব ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিমালা সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য একটাই— সম্পদ যেন কখনো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধের কারণ না হয়।

উপাসনা বলেন, অর্থ মানুষের জীবনকে সহজ করতে পারে, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ হওয়া উচিত নয়। তার দাদা এমন নীতিমালা তৈরি করেছিলেন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে।

উপাসনার বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল নারী-পুরুষ সমতা নিয়ে তার মন্তব্য। তিনি স্বীকার করেছেন যে একসময় তাদের পরিবারেও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার কিছু প্রভাব ছিল। কিন্তু সেই পরিস্থিতি স্থায়ী হয়নি। পরিবারের মেয়েরা নিজেদের অধিকার নিয়ে সরব হয়েছেন এবং সমান অংশীদারত্ব দাবি করেছেন।

উপাসনা বলেন, পরিবারের নারীরা নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন বলেই আজ নারী ও পুরুষকে সমানভাবে দেখা হয়। ভারতের মতো সমাজে, যেখানে উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক ব্যবসার নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে পুরুষের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল, সেখানে উপাসনার এ বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

অন্যদিকে রামচরণও শুধু অভিনেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ নন। ভারতের অন্যতম সফল চলচ্চিত্র পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায়। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান একাধিক সফল সিনেমা নির্মাণ করেছে। এ ছাড়া ঘোড়দৌড় ও অশ্বারোহণের প্রতি রামচরণের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। এই আগ্রহ থেকেই তিনি হায়দরাবাদ পোলো অ্যান্ড রাইডিং ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগেও তার অংশীদারত্ব রয়েছে। ফলে রামচরণ ও উপাসনা— দুজনই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছেন।

এবার সংসার সমীকরণ প্রসঙ্গে অভিনেতা রামচরণ বলেছেন, তাদের সংসারের প্রকৃত ‘বস’ উপাসনা। তিনি বলেন, একজন অভিনেতার জীবন অত্যন্ত অনিয়মিত। কখন কোথায় শুটিং, কখন কাজ শেষ হবে— সবকিছুই অনিশ্চিত। এমন জীবনে সংসার সামলাতে অনেক সমঝোতার প্রয়োজন হয়। অভিনেতা বলেন, সেই ভারসাম্য রক্ষায় উপাসনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে উপাসনাও সবসময় স্বামীর সাফল্যে গর্ববোধ করে থাকেন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বাস করেন, একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো— পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তাবোধ এবং একে অপরের সাফল্যকে উদযাপন করার মানসিকতা।

বিনোদন ডেস্ক

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *