
উপমহাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আদনান সামিকে ঘিরে পাকিস্তানে বহু বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান ছেড়ে ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করার কারণে দেশটিতে তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’, ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবেও দেখা হয়। সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে আদনান সামির ছেলে আজান সামি তার বাবাকে কীভাবে দেখেন- সেই বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছন।
পাকিস্তানের গায়ক থেকে নায়ক হয়ে উঠা আজান জানান, বাবাকে অস্বীকার করতে বললেও তিনি তা কখনোই করবেন না।
সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা তার নতুন ড্রামা সিরিজ ‘ম্যায় মান্টো নাহি হুঁ’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আজান বাবাকে ঘিরে বিতর্ক, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও শিল্পীজীবনের নানা দিক তুলে ধরেন।
আজান বলেন, ছেলে হিসেবে তিনি আদনান সামিকে বোঝেন, তবে পাকিস্তানি হিসেবে অনেক বিষয়ে তাদের মতভেদ রয়েছে। বাবার ভারতীয় নাগরিকত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, শিল্পীদের হৃদয় ভীষণ নাজুক হয়, রাজনৈতিক কিছু কষ্ট তার বাবাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। ‘আমি বিষয়টা বুঝি, কিন্তু বাবার হয়ে সাফাই গাইতে আসিনি’, যোগ করেন তিনি।
অভিনেতা জানান, তাকে অনেকবার প্রকাশ্যে বাবাকে অস্বীকার করতে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তার স্পষ্ট জবাব—‘আমার বাবা আমার বাবা-ই থাকবেন। আমি তাকে গভীরভাবে ভালোবাসি এবং শ্রদ্ধা করি।’
এই অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষার কথা জানাতে গিয়ে আজান বলেন, পৃথিবীতে ঘৃণা এখনও অনেক বেশি। তিনি বলেন, ‘যখনই আমি ইনস্টাগ্রামে ভালো কোনো ছবি পোস্ট করি, কিছু মন্তব্য আসে—‘দেশদ্রোহীর ছেলে’। তখন সেই ঘৃণার ছোট্ট অংশ আমাকেও সহ্য করতে হয়।’ আজান স্পষ্ট করে জানান, তিনি দেশপ্রেমিক পরিবার থেকে এসেছেন এবং পাকিস্তানকে ভালোবাসেন। ‘আমাকে কি সারাজীবন দেশপ্রেম প্রমাণ করে যেতে হবে?’ প্রশ্ন রাখেন তিনি।
আজান মানুষের প্রতি আহ্বান জানান—‘বাবার পাপের দায় ছেলেকে দেবেন না।’ তবে এ অভিনেতা স্পষ্ট করেন, তিনি তার বাবা আদনান সামির কাজকে পাপ মনে করেন না।
নিজের ক্যারিয়ার প্রসঙ্গে আজান জানান, ছোটবেলায় তিনি ভীষণ আত্মবিশ্বাসহীন ছিলেন এবং মনে করতেন, পাওয়া ভালোবাসা কেবল বাবা-মায়ের খ্যাতির কারণে। সেই অনিশ্চয়তা থেকেই তিনি অভিনয় ও সঙ্গীতের জগতে প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
মা জেবা বখতিয়ার প্রসঙ্গে আজান বলেন, ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি সবসময় মায়ের পরামর্শ নেন। এমনকি প্রতিটি নাটক মুক্তির পরও মায়ের বিশ্লেষণ শোনেন।
‘ম্যায় মান্টো নাহি হুঁ’-তে কাজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে আজান বলেন, শোবিজের সেরাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সহশিল্পী হুমায়ুন সাঈদকে তিনি একজন অভিনেতা ও মানুষ হিসেবে আদর্শ মনে করেন। তবে সায়মা নূরের সঙ্গে অভিনয়ের সময় খানিকটা অস্বস্তি কাজ করে বলে স্বীকার করেন আজান। কারণ, ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে নাটকের সেটে গিয়ে সায়মাকে প্রথম দেখেছিলেন তিনি। তাই দৃশ্যের প্রয়োজনে তাকে অভদ্র হতে হলে আগে থেকেই ক্ষমা চেয়ে নেন।
প্রসঙ্গত, আদনান সামি ও পাকিস্তানি অভিনেত্রী জেবা বখতিয়ার ১৯৯৩ সালে বিয়ে করেন। তবে বিয়ের তিন বছর পরেই তাদের বিচ্ছেদ হয়। বর্তমানে আজান সামি তার মাকে নিয়ে পাকিস্তানেই বাস করেন।
অপরদিকে আদনান সামি পর্যটক ভিসায় ২০০১ সালে ভারতে যাওয়ার পর আর পাকিস্তানে ফেরেননি। ঐ বছরই তিনি দুবাইয়ের এক আরব নারী সাবাহ গালাদারিকে বিয়ে করেন। কিন্তু দেড় বছর পরেই তাদের ডিভোর্স হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে সাবাহ মুম্বাইয়ে ফেরত আসেন এবং সামিকে আবার বিয়ে করেন। তবে এক বছরের মাথায় তাদের ফের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
এরপর ২০১০ সালে সামি ভারতের সেনাবাহিনীর এক জেনারেলের মেয়ে রয়াকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
২০১৫ সালে আদনান সামি ভারতে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করলে ভারত সরকার তা অনুমোদন করে।
আদনান সামি হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি, তেলেগু, তামিল, কন্নড় এবং মালায়লাম ভাষায় বহু গান গেয়েছেন। তার ঝুলিতে আছে বলিউডের বহু জনপ্রিয় প্লেব্যাক গান। টাইম অব ইন্ডিয়া তাকে ‘সংগীতের সুলতান’ অভিহিত করেছে। ভারতীয় সংগীতে অবদানের জন্য ২০২০ সালে তাকে ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার প্রদান করে ভারত সরকার।
বিনোদন ডেস্ক





