
বান্ধবী হঠাৎ ফোন দিয়ে বলল, ‘এই, আমাকে ভালো কিছু বইয়ের নাম বলিস তো।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তুই বই পড়িস?’
‘আরে না, তন্ময়কে বলেছি পড়ি। এখন ও আমাকে গিফট দিতে চায়।’
তন্ময় ওর নতুন বফ। আমি বললাম, ‘বলেছিস কেন এমন?’
‘আরে বইটই পড়ি না বললে ইজ্জত থাকে? শুনে বলল, তোমার খুব পড়ার ইচ্ছা কিন্তু কাছে নাই এমন কিছু বইয়ের নাম দিও গিফট করব।’
আমি রাগে রাগে আমার উইশলিস্টের একশ বইয়ের নাম পাঠিয়ে দিলাম। সপ্তাহখানেক পর বান্ধবীর পোস্ট দেখতে পেলাম একশ বইয়ের এবং এক তোড়া লাল গোলাপের ছবি দিয়ে ক্যাপশনে লিখেছে, থ্যাংকস লাভ।
সেখানে একটা ছেলে কমেন্ট করেছে, ধ্যোহ্ন বইটা আগে পইড়েন আপু। দারুণ!
বান্ধবী রিপ্লাইয়ে লিখেছে, হ্যাঁ, ওয়ান অব দা মাস্টারপিস অব জাফর ইকবাল। আমি রিপ্লাইয়ে লিখলাম, জাফর ইকবাল না, হুমায়ূন আহমেদ। ডানের দিকে পাঁচ নম্বর বইটার কথা বলছে।
বান্ধবী রিপ্লাই ডিলিট করে দিল। আমার রাগ উঠে গেল। এদিকে এই একশ বই কেনার জন্য আমি কত কষ্ট করে টাকা জমাই। আমি মাসে দুই-তিনটা করে কিনে কমাই আবার নতুন পছন্দের বই এসে একশ পূর্ণ হয়ে যায়।
কিছুদিন পর বান্ধবীর ফোন, ‘এই, দূর্গা কে রে?’
‘দূর্গা চিনিস না? দেবি দূর্গা। ঠাকুর।’
‘আরে না! আমিও তো প্রথমে তাই মনে করেছিলাম। পরে তন্ময় বলল, দূর্গার মৃত্যুতে ও অনেক কেঁদেছে। আমি বললাম আমিও দুঃখে তিন দিন ভাত খাইনি।’
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ‘পথের পাঁচালীর দূর্গা। তারপর ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলাম।’
এরপর ও বফের হাতের ওপর হাত রেখে একটা ছবি তুলে আমাকে পাঠাল। বলল, ‘ক্যাপশন বল। বইয়ের যেন হয়।’
বললাম, ‘মাথায় আসছে না।’
ও রেগে বলল, ‘এত কী বই পড়িস? এমন একটা কবিতা মনে কর যেটাতে হাতের ওপর ভালোবেসে হাত রাখা নিয়ে সুন্দর কথা লেখা আছে।’
‘আমি গল্পের বই পড়ি, কবিতা না। গুগলে সার্চ দিয়ে খোঁজ।’
আরেক দিনের কথা। ভোরবেলায় আমার ঘুম নষ্ট করে ফোন দিয়ে তড়িঘড়ি করে বলল, ‘তুই আজ শেষের কবিতা বইটা পড়বি।’
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, ‘পড়েছি।’
‘আবার পড়বি। তন্ময় আজ আমাকে ওটা পড়তে বলেছে। ও প্রশ্ন করতে পারে। যদি করে তুই স্ট্যান্ডবাই থাকবি।’
সেদিন রাতে তন্ময়ের সঙ্গে আমাকে অমিত-লাবণ্যের জটিল কেমিষ্ট্রি নিয়ে আলোচনা করতে হলো। মাঝখান থেকে বান্ধবী নিজে শুধু বলল, ‘সবচেয়ে জোর ব্যাপার হলো আমার বান্ধবীর নাম আর বইয়ের নায়িকার নাম এক।’
আমার কাছে এটাকে সবচেয়ে জোর কিছু বলে মনে হলো না। এর মধ্যে একদিন ও কাশফুলের মধ্যে একটা বই নিয়ে শুয়ে পড়ল। আমি বিব্রত ভঙ্গিতে এদিকে-ওদিক তাকাচ্ছি। এদিকে ও রিল্যাক্স মুডে শুয়ে সহজ গলায় বলল, ‘তোল, ভালো করে তোল। প্রোফাইল পিক দিবো।’
এরপর সুন্দর একটা ছবি এডিট করে প্রোফাইল দেয়ার পরে আমি কমেন্ট করলাম, ‘বইটার কোন অংশটা তোর সবচেয়ে বেশি ভালো লাগল?’
ও রিপ্লাই করল, ‘যে অংশে ওই যে একজন মারা গেল। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।’
‘কিন্তু বইটা তো কমেডি বই! কেউ মারাই যায়নি।’ সামনাসামনি ওকে এ কথা বলতেই জিভ কেটে বলল, ‘আমি আন্দাজে ঢিল মেরেছি। আসলে বেশিরভাগ বইয়েই তো কেউ না কেউ মরে! যাক গে।’
কিছুদিন পর আবার এক কান্ড। ফেসবুকে পোস্ট দিল, পৃথিবীতে অনেক খারাপ ছেলে আছে কিন্তু একটাও খারাপ প্রেমিক নাই- হুমায়ূন আহমেদ।
আমি কমেন্ট করলাম, ‘হুমায়ূন আহমেদ এমন কথা বলেননি। বাবা প্রসঙ্গে এরকম একটা কথা আছে।’
ও বলল, ‘বলেছে, তুই জানিস না। চুপ কর।’
আমি চুপ করতে নারাজ। বললাম, ‘খারাপ প্রেমিক তো অহরহই আছে। চারপাশে খারাপ প্রেমিকই তো বেশি দেখি। তোর আগের বফই তো তোরে চিট করল।’
ও পোস্ট ডিলিট করে ফোন দিয়ে আমার সঙ্গে রাগারাগি করল। আমার কমেন্ট নাকি ওর বফ দেখে ফেলেছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘জানত না তোর আগের কথা?’
ও আরো অবাক হয়ে বলল, ‘জানবে কেন?’
আমি ভেবে দেখলাম তাই তো! যে বফফ্রেন্ড ওকে পড়ুয়া ভাবে সে ওর পাস্ট জানবে কীভাবে? ছেলেটার মাথায় কি কিছুই নাই?
যাইহোক, কিছু দিন পর আমার বান্ধবীর ব্রেকাপ হয়ে গেল। কারণ জানতে চাইবেন না। ওর এমনিতেই কিছুদিন পরপর ব্রেকাপ হয়, আবার নতুন রিলেশনে যায়।
আমি খুশি খুশি গলায় বললাম, ‘এই বিষয়ে একটা ক্যাপশন আমার মনে পড়েছে। প্রেম মানুষকে শান্তি দেয় কিন্তু স্বস্তি দেয় না- এটা দিতে পারিস।’
ও নাকে কেঁদে আমাকে বলল, ‘এখন আমি ওর স্মৃতি নিয়ে কী করি?’
আমি বললাম, ‘তোর বইগুলো আমাকে সেল কর। নতুনের দাম পাবি না। পুরান দামে।’
ও উদাস গলায় বলল, ‘দাম লাগবে না, নিয়ে যা।’ আমি খুশিমনে বই নিয়ে বাড়ি এলাম। এদিকে ওর বফ সরি বলে ওর সঙ্গে আবার প্যাচআপ করে নিল। ও আমাকে ফোন দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘বইগুলো দিয়ে যা।’
আমি রাগী গলায় বললাম, ‘গাড়ি ভাড়া দিবি। বারবার বই আনো, নাও।’ ও রাজি হলো না। খুব কিপ্টা এমনিতে।
কিছুদিন পর আবার হাতের ওপর হাত রেখে পোস্ট। এবার ক্যাপশন খুঁজে পেয়েছে।
লিখেছে, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম প্রেম বলে কিছু নেই। মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, তখন প্রতিটি প্রেমই প্রথম প্রেম।
জান্নাতুল ফেরদৌস লাবণ্য
সূত্র: যুগান্তর
