বাহাসনামা : একটি ফেইসবুক জার্নালিজম

  ৩১, জুলা ২০১৬  |    Slider, বিশেষ প্রতিবেদন  |    1147

বাহাসনামা

বাহাসনামা : সমসাময়িক বিষয় নিয়ে মিডিয়াকথায় বিশেষ এই লিখাটি প্রকাশ করা হল।

ঘটনা-১ : ধরা যাক আপনি একজন সেলিব্রেটি এবং আপনার নাম অমুক ।ঘুম থেকে উঠে মুখে ব্রাশ গুজে ঢুকেছেন টয়লেটে । বিশেষ কাজটি করতে করতে সামনে দিয়ে উড়ে যাওয়া একটা মশাকে ঠাশ করে মারলেন। বলুন তো এর ফলাফল কি হবে? আপনি যখন ফেইসবুকে বসবেন ততক্ষনে শিরোনাম ছড়িয়ে পড়েছে, “টয়লেটে গিয়ে একি করলেন অমুক !!! দেখুন ভিডিও সহ ।”

ঘটনা-২ : এবার ধরাযাক আপনি একজন নিম্নআয়ের মেহনতি মানুষ এবং নব্য ফেইসবুক ব্যবহারকারী । অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে কিনেছেন স্মার্ট ফোন, হোক না সেটা চাইনিজ । কোন একদিন মোবাইল ঘাটতে ঘাটতে গন্তব্যে ফিরছেন । রাস্তার ধারের সুয়ারেজে একটি শিশুকে পড়ে যেতে দেখলেন, কি হবে এরপর? যথারীতি ফেইসবুকে ভাইরাল হয়ে যাবে ছোট্ট শিশুটির পানিতে ডুবে যাবার ভিডিওটি । আর আপনি হয়ত গর্বের সুরেই বলবেন, ভিডিওটি আমি নিজ হাতে করেছিলাম ।

ঘটনা-৩ : এবার ধরুন আপনি হুজুর গোছের একজন মানুষ। ধর্মাচার পালনে বেশ কড়াকড়ি আপনার, অথচ কাটিয়ে উঠতে পারছেন না ফেইসবুক নেশা । কোন শপিংমলে গেছেন জুব্বা কিনতে; হঠাৎ একটা স্বল্পবসনা নারীর দিকে চোখ পড়ল আপনার; ফলাফল কি হবে? আপনার প্রোফাইল থেকে মেয়েটির ছবি শেয়ার হবে এবং নিচে ক্যাপশন যাবে “ এই নারীর জন্য কতটি জুতার বাড়ি হবে বন্ধুরা ? ” উপরের ঘটনা তিনটি পৃথক হলেও উদ্দেশ্য মোটামুটি একই, ফেইসবুক নামক মিডিয়াতে তথ্যাকারে ছড়িয়ে দেয়া ।কাজগুলোর তাই সহজিয়া নাম দেয়া যেতে পারে ফেইসবুক জার্নালিজম ।অপদার্থ লেখক আর হৃদয়হীন পাঠকের খাপে-খাপ সমন্বয়ে আন্তনগর মেইলট্রেনের মতন ছুটছে এই ফেবু জার্নালিজম, যেখানে জ্বালানী হিসেবে কাজ করছে লাইক-শেয়ার-কমেন্টস । বি-ক্যাটাগরির বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের জন্য আর্শীবাদ হয়ে আসা এই ফেইসবুকীয় মাধ্যমটি এরই মধ্যে আলোচনার উত্তাপে জুড়েছে শতাধিক যৌনতা আর চরিত্রহননের গল্প । যেগুলো পাঠ করে দেয়াল থেকে খোসে যাওয়া চুনের মতন খোসে যাচ্ছে রুচিশীল মানুষটির রুচিবোধের শেষ অংশটিও; বিশ্বাস ঢেলে দিচ্ছেন বানানো এই খবরগুলোতে ।

চরিত্রহননের সবশেষ ঘটনাটা খুব সাম্প্রতিক ।সুন্দরবনের বুকে বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে। একদিকে বিভিন্ন মহল জানিয়ে যাচ্ছেন উদ্বেগ, প্রস্তুতি নিচ্ছেন রাস্তায় নামার। অন্যদিকে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরুহবে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের । সরকারের কাছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসংগঠন গুলো নিজেদের আবেদন জানানোর মাঝপথেই পা-কাটলো পঁচা শামুকে । মেধার সংকটে ধুঁকতে থাকা একটি নাট্যদল নিজেদেরকে আলোচনায় আনতে বেছে নিলেন সুন্দরবন ইস্যুকে; আর আশ্রয় নিলেন ফেইসবুক জার্নালিজমের ।

সুন্দরবন নিয়ে দলটি একটি নাটক তৈরির চেষ্টা করেছে । নাটকটি দেখানো হবে, তবে তার আগে চলবে বাহাস (বাহাস হচ্ছে নিদৃষ্ট কোন বিষয়কে নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন) । ২০শে জুলাইয়ের সেই আয়োজনে অতিথি করা হয়েছে শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদকে । যেহেতু শিল্পকলার নীতিমালায় সুস্থ সংস্কৃতিকে সমাদর করা হয় এবং রাজনৈতিক ইস্যুতে বাহাস কোনভাবেই সংস্কৃতির অর্ন্তভুক্ত নয়, তাই স্বাভাবিক ভাবেই শিল্পকলা এই বাহাস করার অনুমতি দেয়নি । দলটির পরিচালকের ক্ষোভের মাত্রা বাড়লো ।শিল্পকলার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে চলল উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং ছুটোছুটিও হল কয়েকদফা । শেষতক দাড়ালেন নাট্যজন মামুনুর রশীদের সামনে।তার দলের কর্মীরাও দ্বায়িত্ব বুঝে নিল; কথোপকথনগুলো ধারন করতে শুরু করল নিজেদের র্স্মাট ফোনে যাতে পরবর্তীতে ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে সামজিক মাধ্যমে, অর্থ্যাৎ শুরু হল ফেইসবুক জার্নালিজম ।

ফলাফল এসেছে হাতে নাতে । ভায়রাল হল ফেসবুকে নাট্যব্যক্তিত্ব মামনুর রশীদের বিব্রত হবার সেই ভিডিওটি । অসম্পূর্ণ বক্তব্যও শোনা গেল সেখানে । আর এরই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে উঠল রণাঙ্গন ।নাট্যচর্চার সাথে জড়িতদের অনেকে নেমে গেলেন কথার যুদ্ধে। যুক্তির কৌটা খুলে তক্কাতক্কি করতে গিয়ে সুন্দরবন আন্দোলনের ছিপিটা গেল আটকে । নাট্যজন মামুনুর রশীদ বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, যদি শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চকে বাহাসের জন্য ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয় এবং পরবর্তিতে কোনও একটি রাজনৈতিক দল যদি সেই সুযোগটা নিতে চায়, আমরা কি তা বন্ধ করতে পারবো? মহানগর নাট্যমঞ্চে যখন এই প্রশ্রয়টি রাজনৈতিক দল পেলো, সেখানে আর নাটক করার কোনও পরিবেশ থাকলো? নাটক সেখান থেকে বিতাড়িত হলো। নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের পাশে এসে দাড়ালেন দেশবরেণ্য শিল্পীরা ।শিল্পকলার মহাপরিচালক জানিয়ে দিলেন নাট্যশালার মঞ্চে রাজনৈতিক কর্মকান্ড যেন পরিচালিত না হতে পারে সেজন্য কড়া নজরদারী থাকবে । সমাধান মিলল আপাতত । তবে কিছু প্রশ্নের যুতসই উত্তর মেলাটা খুবই জরুরী ।

যেমন:

• নাট্যশালায় নাটকের জন্য আবেদন করা হয়েছে, বাহাসের জন্য আবেদন করা হয়নি কেন? আবেদন না করেই আনু মুহাম্মদের মতন সম্মানিত অতিথিকে আমন্ত্রন করার যৌক্তিকতা কি? সেক্ষেত্রে এই অধ্যাপককে বিব্রত করার দায়টা কে নেবে?

• কারো বক্তব্য ধারন করতে গেলে তার অনুমতি নেয়া সামাজিক শিষ্ঠাচার ।নাট্যজন মামুনুর রশীদের বক্তব্য ধারনের সময় তার অনুমতি না নেয়ার কারনটা কি?

• বক্তব্য ধারনই যদি করা হবে তবে আংশিক ভাবে উপস্থাপন কেন? ইউটিউবে আপ করা ভিডিওটির শিরোনামটাই বা এমন আক্রমনাত্নক কেন?

• সর্বপরি যে ভিডিওটি এমন বির্তকের জন্মদিচ্ছে, সেগুলো এভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়াটা কোনোভাবে আইসিটি ৫৭ ধারাকে লঙ্ঘন করে কিনা ? যদি করে থাকে তবে সেটার সাজা পেতে এই নাট্যদল কতটা প্রস্তুত ?

পরিশেষ : তথাকথিত বাহাসনামা বিষয়ক এই নাট্যদলের পরিচালক সাহেব হয়ত এখন থেকে দুবছর পরের কোন সকালের কথা ভাবতে পারেন; চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দৈনিক পত্রিকাটি হাতে নিয়ে বসেছেন তিনি । শিরোনামে চোখ আটকে যাওয়াটা বিচিত্র কিছু হবে না তার, যদি লেখা থাকে “আজ উদ্বোধন হবে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের” ।আক্ষেপে হয়ত পুড়বেন তিনিও, বাহাসের নামে অযথা বির্তককে সামনে না আনলে হয়ত পারতেন সুন্দরবন বাঁচানোর আন্দোলটাকে আরো সুশৃঙ্খল করতে, তাতে ফলাফলটাও হতে পারতো ইতিবাচক ।

রাকিব হাসান রোমান সাংবাদিক, নাট্যকর্মী (আরণ্যক নাট্যদল)

সংশ্লিষ্ট খবর

রান আউট অফিসিয়াল ট্রিজার (ভিডিও)

  ২৯, সেপ্টে ২০১৫  |    1092

’মা’- তুমি স্বর্গ

  ৮, মে ২০১৬  |    2138

রানা প্লাজা ট্রাজেডির ৩ বছর

  ২৪, এপ্রি ২০১৬  |    1029