এক দরিদ্র সংগ্রামী মায়ের সন্তান কে ডাক্তার বানানোর গল্প !

  ৮, মার্চ ২০১৬  |    Online Desk, বিশেষ প্রতিবেদন  |    1779

‘মা’ – ছোট্ট একটা শব্দ, কিন্তু কি বিশাল তার পরিধি! সৃষ্টির সেই আদিলগ্ন থেকে মধুর এই শব্দটা শুধু মমতার নয়, ক্ষমতারও যেন সর্বোচ্চ আধার৷ মা এর অনুগ্রহ ছাড়া কোনো প্রাণীরই প্রাণ ধারণ করা সম্ভব নয়৷ তিনি আমাদের গর্ভধারিনী, জননী ,জন্মদাত্রী হিসেবে আমার, আপনার, সকলের জীবনে মায়ের স্থান সবার ওপরে৷ তারাই নারী  শত শত শোষণের মাঝে যারা আজও দিচ্ছে জীবন পাড়ি….।তাই তাঁকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিনের হয়ত কোনো প্রয়োজন নেই।মা ও যে একজন নারী, এ বিষয়টি বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনও স্পষ্ট নয়৷ বরং সন্তানের কাছে পরম ভরসা আর ভালোবাসার প্রতীক মায়েরা বারংবার স্বামী বা অন্য পুরুষের হাতে নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছেন ৷ নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। কিন্তু অধিকার আদায়ে আন্দোলন করে গেছেন নারীরা। এই অধিকার আদায়ের নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনাপঞ্জিই এনে দিয়েছিল ৮ই মার্চ-আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ দিনটিকে ঘিরে দেশ ও বিদেেশর আনাচে কানাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সংগ্রামী, সাহসী ও সফল নারীদের জীবন কাহিনী তুলে ধরবো আজ আপনাদের মাঝে ।

অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার মধ্যে নয় একজন মাটি কাটা নারী শ্রমিক ছেলেকে ডাক্তার বানাচ্ছেন।তেমনি এক সংগ্রামী নারী মর্জিনা বেগম। এই মা রাস্তায় মাটি কাটার কাজ করে তার সন্তানকে ডাক্তার বানাচ্ছেন। মানিকগঞ্জ থাকা সংগ্রামী এ নারীর জীবন কাহিনী১৭ বছর আগে দুই শিশু সন্তান রেখে মর্জিনা বেগমের স্বামী মারা যান।এরপর থেকেই শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ।সংসারের হাল ধরতে কখনো অন্যের বাড়িতে, কখনো আবার কাজ করেছেন ফসলের মাঠে। এখনও মর্জিনা বেগম কেয়ার বাংলাদেশের হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের একজন তালিকাভুক্ত মাটি কাটা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু এই সংগ্রামী নারী তার ছেলেকে বানাচ্ছেন এমবিবিএস ডাক্তার।ছেলে রিপন বিশ্বাস ঢাকার একটি মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র।মেয়ে সুরমা আক্তার এইচএসসি পরীক্ষার্থী।তাকেও আইনজীবী বানাতে চান মর্জিনা।মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আরুয়া ইউনিয়নের বাউলিকান্দা গ্রামে মর্জিনা বেগমের বাড়ি। স্বামীর নাম লালন বিশ্বাস। কাঠমিস্ত্রি স্বামী ঢাকায় কাজের খোঁজে গিয়ে আর ফিরেন নি। পরে জানতে পারেন তিনি মারা গেছেন। তখন ছেলের বয়স ৫ বছর। আর মেয়ের দেড় বছর। স্বামীর ভিটে বলতে কিছুই ছিল না। বাবার বাড়িতে ভাইয়ের সঙ্গে একটি ছাপড়া ঘর তুলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে বসবাস করছেন মর্জিনা বেগম। বাউলিকান্দা গ্রামে মর্জিনা বেগম কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে একটি কাঁচা রাস্তা সংস্কারের কাজ করছেন। তপ্ত রোদে কোদাল চালাতে গিয়ে যেন ক্লান্ত তার দেহ। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তান নিয়ে চোখে মুখে অন্ধকার দেখছিলেন। সন্তানদের মুখে দু’বেলা দু`মুঠো ভাত জোটাতে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেছেন। ক্ষেত-খামারে কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। ছেলে রিপন বড় হওয়ার পর মায়ের সঙ্গে কাজ করতেন।  ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তা তৈরি এবং সংস্কার করাই কেয়ার বাংলাদেশ তাদের কাজ। মাটি কাটা শ্রমিক হিসেবে মর্জিনা বেগম   ৫ বছর ধরে কেয়ার বাংলাদেশ এর তালিকাভুক্ত ।মর্জিনা বেগমের  অভাবের সংসারের  মধ্যে দুই ছেলে-মেয়ের লেখাপড়াকে আত্মীয়-স্বজন আর প্রতিবেশিরা বাঁকা চোখে দেখতো সব সময় । ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন আত্মীয়-স্বজন আর প্রতিবেশিরা কিন্তু ছেলের একের পর এক ভালো রেজাল্টে সবাই খুশি হয়েছেন। এ পর্যন্ত আসার পেছনে এলাকাবাসীও অনেক আর্থিক সহযোগিতা করেছেন।ছেলেকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন মর্জিনা বেগম এর । ছেলেও সেই ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিয়ে লেখাপড়া করেছে। এজন্যই মর্জিনা বেগম এর স্বপ্ন আজ পূরণ হওয়ার পথে অনেক টা পথ এগিয়ে । মুখে এক গাল তৃপ্তির হাসি এখন মর্জিনা বেগম এর মুখে, আজ আর আমার কোনো কষ্ট নেই। আমি সব কষ্টের কথা ভুলে গেছি। ছেলে ডাক্তার হচ্ছে, গরিব দুখীর মানুষের সেবা করতে পারবে এতেই আমার সুখ । মেয়েকে উকিল বানাবো , যেন সেও মানুষকে আইনি সেবা দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করতে পারে ।মর্জিনা বেগমের ছেলে বিপ্লব বিশ্বাস পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছিল। সবগুলো পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। হরিরামপুরের ভাদিয়াখোলা ফিরোজা আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে S.S.C এবং ঢাকা আইডিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য সমাজের বিভিন্ন কর্তা ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন বিপ্লব। পরে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম আনোয়ারুল হকের মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে যান তিনি। তার সুপারিশেই ঢাকার গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজে দরিদ্র কোটায় ভর্তির সুযোগ পান বিপ্লব। বর্তমানে তিনি এমবিবিএসের শেষ বর্ষের ছাত্র। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অধীনে সারাদেশের ৫ জন মেডিকেল শিক্ষার্থীদের যে শিক্ষাবৃত্তি দিয়েছিলেন বিপ্লব বিশ্বাসও তাদের একজন। মাসিক ২০০ টাকা করে প্রধানমন্ত্রীর সেই বৃত্তির টাকা এখনও পাচ্ছেন বিপ্লব।বিপ্লব বিশ্বাস বলেন , আমার মা মাটি কেটে আমাদের মানুষ করেছেন। আমার মায়ের মতো এতো পরিশ্রম ও মনের জোর থাকলে ডাক্তার কেন দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব। বিপ্লবের স্বপ্ন ডাক্তার হয়ে গ্রামে মায়ের নামে একটি হাসপাতাল গড়ে তুলবেন। যেখানে এলাকার গরিব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হবে। তিনি বলেন, মায়ের স্বপ্ন বোনকে আইনজীবী বানানো। সেই স্বপ্ন পূরণে বোনকেও অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।ভবিষ্যতে সে দেশের মঙ্গল বয়ে আনবে।অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার মধ্যে নয় একজন মাটি কাটা নারী শ্রমিক ছেলেকে ডাক্তার বানাচ্ছেন। মর্জিনা বেগমের এই সংগ্রামী গল্প গ্রামের সবার মুখে মুখে। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের `জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কার্যক্রমের আওতায় `সফল জননী নারী’ ক্যাটাগরিতে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছিলেন মর্জিনা বেগম। মা তোমায় সালাম । আজ মর্জিনা বেগমের এই সংগ্রামী কাজ এর জন্য আমরা গর্ব করে বলতে পারি সফল জননী নারী তুমি ।এই আধুনিক যুগে এসেও সমাজ আর কুসংস্কারের যাতা কলে পিষ্ঠ হয়ে কোন নারীকে যাতে শোষণের শিকার হতে না হয় সে কামনাই করি….

সকল নারীর প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা

নারী জাতির জয় হোক…
নারী শিক্ষার জয় হোক…

সংশ্লিষ্ট খবর

অভিনয় ছেড়ে ব্যবসায় নিপুণ ?

  ২, এপ্রি ২০১৬  |    467

বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ে আসিফ

  ১৫, সেপ্টে ২০১৫  |    846

লুজারের শীর্ষে এপেক্স ট্যানারি

  ১০, সেপ্টে ২০১৫  |    740